মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের একটি হাসপাতালের মর্গে ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে পড়ে আছে দীন মোহাম্মদ নামের এক বাংলাদেশির মরদেহ। পাসপোর্ট অনুযায়ী তিনি কুমিল্লার বাসিন্দা হলেও, বাংলাদেশে ব্যাপক খোঁজাখুঁজির পরও এখন পর্যন্ত তার কোনো পরিবার বা স্বজনের সন্ধান মেলেনি। ফলে মরদেহটি এখনও হাসপাতালের হিমঘরেই রয়েছে।
দীন মোহাম্মদ যে বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, সেখানকার কর্মকর্তারা কুয়ালালামপুর ও বাংলাদেশ—দুই জায়গাতেই তার কোনো স্বজনকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে অন্তত কেউ মরদেহটি গ্রহণ করতে পারেন। পাসপোর্টে উল্লেখিত স্থায়ী ঠিকানার সূত্র ধরে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও জানান, ওই এলাকায় দীন মোহাম্মদ বা তার পরিবারের কোনো সদস্যের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা দীন মোহাম্মদের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছেন এবং তার স্বজন বা অভিভাবককে শনাক্ত করার জন্য কাজ শুরু করেছেন। ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক নুর জানিয়েছেন, স্বজনদের খুঁজে পাওয়া গেলে মরদেহ বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দীন মোহাম্মদের বাবার নাম আব্দুল হক এবং মায়ের নাম সুক্কুরের নেসা। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে লেখা আছে—রাজা বাড়ি, কুমিল্লা সদর, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা। তার জন্মতারিখ ২ মার্চ ১৯৭৫। জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই ঠিকানাসহ বাবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পাসপোর্টে ফোন নম্বরের জায়গায় শুধু “০০৮৮” লেখা রয়েছে। পাসপোর্টটি সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে নবায়ন করা হয় এবং এতে আগের পাসপোর্ট নম্বরও উল্লেখ আছে।
কুমিল্লার ওই এলাকার চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন বলেন, "প্রশাসনের কাছ থেকে খবর পেয়ে ব্যাপক খোঁজ করেছি। আমি আমার এলাকার কমবেশি সবাইকে চিনি। আমার গ্রামের একটা পাড়ার নাম রাজাবাড়ি। কিন্তু দীন মোহাম্মদ, পিতা- আব্দুল হক এই নামে কাউকে পাইনি। এমনকি আব্দুল হক নামে কোনো পিতার সন্তান দীন মোহাম্মদ এমন কাউকেও পাইনি"।
প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশি জানিয়েছেন, ২০১১ সালের দিকে মালয়েশিয়ায় অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন অনেক শ্রমিক হাইকমিশনের মাধ্যমে পাসপোর্ট নিয়ে বৈধ হয়েছিলেন। কেউ কেউ দাবি করছেন, দীন মোহাম্মদও সে সময় প্রথম পাসপোর্ট করেছিলেন, যদিও এ তথ্য অন্য কোনো সূত্রে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তার কর্মস্থলের সহকর্মীরা বলছেন, তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন।
দীন মোহাম্মদ নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। একই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশি সুপারভাইজার মো. মোস্তফা আহমদ জানান, মৃত্যুর মাত্র ১৯ দিন আগে তিনি তাদের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি বলেন, "তিনি নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। যে প্রজেক্টে তিনি কাজ করছিলেন তার সুপারভাইজার আমার বন্ধু। ২৫শে জুলাই রাতে তিনি তার থাকার জায়গায় এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। পরে রাতে কোনো এক সময় গোসল খানায় গিয়েছিলেন। সেখানেই ভোরে তাকে পড়ে থাকতে দেখেন অন্যরা। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায় স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন তিনি,"
মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। কিন্তু সহকর্মীদের মধ্যে এমন কাউকে পাওয়া যায়নি, যিনি তাকে ভালোভাবে চিনতেন। মোস্তফা আহমদ বলেন, "পাসপোর্ট ভিসা থাকায় ভাবলাম সহজেই মরদেহ দেশে পাঠানো যাবে। কিন্তু তার সহকর্মীদের মধ্যে তেমন কাউকে পেলাম না যিনি দীন মোহাম্মদকে ভালোভাবে চেনেন। পাসপোর্ট থেকে ফোন নম্বর নিতে গিয়ে দেখা গেলো ফোন নাম্বার নেই। একজনের কাছ থেকে খবর পেলাম ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে কোনাপাড়া স্কুলের কাছে তাদের আত্মীয় স্বজন আছে। সেখানে লোক পাঠিয়েও কারও হদিস পেলাম না,"
এরপর তিনি কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ মিশন, কুমিল্লার উপজেলা প্রশাসন এবং ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ দীন মোহাম্মদের পরিবার বা স্বজনের কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। অন্যদিকে হাসপাতাল ও পুলিশ দ্রুত মরদেহ গ্রহণের জন্য চাপ দিচ্ছে।
আরও জানা গেছে, পাসপোর্টে ব্যক্তিগত নম্বর হিসেবে যে নম্বরটি দেওয়া ছিল, সেটি কুমিল্লার অন্য এক জীবিত ব্যক্তির নামে পাওয়া গেছে। মোস্তফা আহমদের দাবি, ২০১১ সালে মালয়েশিয়া সরকার যখন অবৈধ বাংলাদেশিদের বৈধ করার সুযোগ দেয়, তখন দালালদের মাধ্যমে একই জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক পাসপোর্ট করার অভিযোগ উঠেছিল।
মালয়েশিয়ার আইন অনুযায়ী দীন মোহাম্মদকে তাৎক্ষণিকভাবে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা যাচ্ছে না। মোস্তফা আহমদ বলেন, "আমরা সেটি করতেও পারি না। কারণ দুই দিন পর তার পরিবারের কেউ এলে কী জবাব দিবো। কিন্তু মরদেহ মর্গে রাখায় প্রতিদিন আমাকে ৭৫ রিঙ্গিত ফি দিতে হচ্ছে, আবার পুলিশও ডিস্টার্ব করছে," তিনি আরও জানান, বিষয়টি হাইকমিশন ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ে প্রথম দুই দিন কেউ ফোন না ধরলেও পরে একজন কর্মকর্তা শুধু বলেছেন, “দেখতেছি”।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার (লেবার) সিদ্দিকুর রহমান বলেন, "তিনি বিভিন্ন সময়ে যাদের সাথে কাজ করেছেন তাদের কাছে যাবো। আশা করি স্থায়ী ঠিকানার সন্ধান বের করতে পারবো," আর হাইকমিশনের লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, "সংশ্লিষ্ট জেলা উপজেলার প্রশাসনের মাধ্যমে সাধারণত পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। সেভাবে পাওয়া না গেলে তার ছবি পাসপোর্ট সামাজিক মাধ্যমে দিয়ে অনুসন্ধানের চেষ্টা করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সফল হই। এক্ষেত্রেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো যাতে দীন মোহাম্মদের মরদেহ পরিবারের কাছে পাঠানো যায়,"
তবে হাইকমিশন ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত যদি কোনো স্বজন বা অভিভাবকের সন্ধান না মেলে, তাহলে দীন মোহাম্মদের শেষ ঠিকানা হতে পারে মালয়েশিয়ার মাটিই। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, "আসলে একেবারেই কাউকে না পাওয়া গেলে আর কি-ই বা করার থাকে। কাউকে না কাউকে তো মরদেহ গ্রহণ করার জন্য পেতে হবে,"







